বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১৩, ২০২২




আইভীর ছোঁয়ায় নান্দনিক নাসিক, আছে কিছু অসন্তোষও

নারায়ণগঞ্জ প্রতিদিন রিপোর্ট:

পৌর মেয়র হিসেবে পাঁচ বছর ও সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে ১০ বছর- সব মিলিয়ে ১৫ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জ সিটির লাগাম ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর হাতে। সিটির যা কিছু উন্নয়ন, যা কিছুতে পিছিয়ে- সবকিছুর দায় অনেকটা তাই তার। ঐতিহ্যবাহী এ বন্দর নগরীর সাধারণ মানুষ মনে করেন এমনটি।

সড়ক প্রশস্তকরণ, সড়কে এলইডি বাতি, শেখ রাসেল পার্ক, বাবুরাইল খাল উন্নয়ন, সিদ্ধিরগঞ্জ খাল উন্নয়ন ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত পাইকপাড়া মিউচুয়াল ক্লাব উন্নয়নসহ প্রায় ১৫টি উন্নয়নমূলক কাজ আইভীর সফলতা মনে করে নগরবাসী। পাশাপাশি নগরবাসীর কিছু দাবিও রয়েছে আইভীর কাছে। অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে হোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্স। বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, যানজট ও মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ নগরবাসী। এসব সমস্যা নিরসনে আইভী বা যে প্রার্থী অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন মূলত তার পাশে ভোটাররা থাকবেন বলে সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়।

আগামী ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এতে মেয়র পদে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকার ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও বিএনপির বিভিন্ন পদ থেকে অপসারিত স্বতন্ত্রপ্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার। ঢাকার পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ এ শিল্প নগরী এখন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় মুখর। ভোটাররাও গত ১৫ বছরের খতিয়ানের পাশাপাশি আমলে রাখছেন আগামী পাঁচ বছরের প্রতিশ্রুতিতে।

সিটি করপোরেশনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের দিক থেকে নগরবাসী অনেকটা এগিয়ে রাখছেন সেলিনা হায়াৎ আইভীকে। আবার কিছু সুবিধা কমা ও কিছু বিষয় সমাধান না হওয়ায় আইভীর ওপর অসন্তোষও রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড সংখ্যা ২৭। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে ৮টি, সিদ্ধিরগঞ্জে ১০টি এবং বন্দরে ৯টি। এই ২৭টি ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৭ হাজার ৩৫৭। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৩৪ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫১৯। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৮৭টি, মোট ভোটকক্ষের সংখ্যা ১ হাজার ৩০১টি এবং অস্থায়ী ভোটকক্ষের সংখ্যা ৯৫টি।

হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের ওপর প্রতিটি সিটি করপোরেশেনের উন্নয়ন কার্যক্রম নির্ভর করে। যেখানে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে হোল্ডিং ট্যাক্স মাত্র ৭ থেকে ১০ শতাংশ, রাজধানী ঢাকার গুলশান-বনানীতে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ শতাংশ, সেখানে নারায়ণগঞ্জ সিটিতে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে ২২ শতাংশ। ফলে নগরবাসী হোল্ডিং ট্যাক্স দিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বর্তমানে হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া প্রায় ৩৪ কোটি টাকা। ট্রেড লাইসেন্স বেড়েছে কয়েকগুণ। ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে শুরু করে ব্যবসাভেদে এখন ট্রেড লাইসেন্স ১০ হাজার টাকা হয়েছে। এছাড়া হকারদের পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদ, অবৈধ রিকশার দাপট ও রহমত উল্লাহ মুসলিম ইনস্টিটিউট গুঁড়িয়ে দেওয়া নিয়ে অনেকে মেয়র আইভীর সমালোচনা করেন।

নগরীর ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাবুরাইলের বাসিন্দা রিপন সাহা। ছোট থেকে বেড়ে ওঠা এই নগরীতেই। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, মেয়রের (সেলিনা হায়াৎ আইভী) অবস্থান এখানে ভালো। নারায়ণগঞ্জের যত উন্নয়ন ওনার হাতে। স্কুল-কলেজ-মাদরাসা, লেক সাইড, নদীর পাড়, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করেছেন আইভী।

নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুয়া বাজারের বাসিন্দা আমিনুর রহমান রাসেল জাগো নিউজকে বলেন, মেয়র নগরীর অনেক উন্নয়ন করেছেন। এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ট্রেড লাইসেন্স ও হোল্ডিং ট্যাক্স অনেক বেশি। মশার উপদ্রব ও যানজট নিয়েও রয়েছে অস্বস্তি। এগুলো একটু কমানো গেলে আমাদের নগরবাসীর জন্য ভালো হতো।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, শেখ রাসেল পার্ক, বাবুরাইল খাল উদ্ধারসহ নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনের আওতায় নারায়ণগঞ্জ, কদমরসুল ও সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে এলইডি স্ট্রিট লাইটের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সড়ক উন্নয়নের কাজও অনেক হয়েছে।

হোল্ডিং ট্যাক্স ও পানির বাড়তি বিল প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে এখন কিছু বলবো না। তাছাড়া এগুলো নিয়ে এখন বলার সময়ও না।

আইভীর দায়িত্বকালে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ

শেখ রাসেল পার্ক
ঘন সবুজে ঘেরা ছায়া ঢাকা নির্মল পানির লেকবেষ্টিত জিমখানা শেখ রাসেল পার্ক এখন নগরীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এর আয়তন প্রায় ১৮ একর। বর্তমান লেকটি এক সময় পরিত্যক্ত জলাশয়/ডোবা ছিল। প্রতিনিয়ত মানুষের বর্জ্য ফেলার কারণে লেকটি ডাম্পিং স্থান ও মশা-মাছির প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এছাড়া অবৈধ দখলের ফলে জিমখানা লেক এলাকার পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাগুলো মাদক ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ফলে লেক এলাকাটির আশপাশে দূষণ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়।

ডা. আইভী জিমখানা লেক খনন, সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের সিদ্ধান্ত নেন। নামকরণ করা হয় শেখ রাসেল পার্ক। পার্কটি নারায়ণগঞ্জ নগরবাসীর একমাত্র বিনোদনকেন্দ্র। প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুল সংখ্যক মানুষ এখানে প্রকৃতির নির্মল পরিবেশ উপভোগে আসেন। লেকটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৭০ মিটার, প্রস্থ ৭৫ মিটার। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে শেখ রাসেল পার্কটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৫৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। লেকের চারপাশে ওয়াকওয়ে, স্ট্রিট লাইট, সিটিং প্যাভেলিয়ন ও পরিবেশবান্ধব সবুজ গাছপালা রোপণ করা হয়েছে। খেলাধুলার জন্য মাঠও রয়েছে একটি।

বাবুরাইল খাল উদ্ধার চলমান
বাবুরাইল খালটি নারায়ণগঞ্জ নগরীর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ধলেশ্বরী পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার বিস্তৃত একটি সংযোগ খাল। অতীতে এই খালের মাধ্যমে পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী নৌকা/ট্রলার মন্ডলপাড়া, বৌবাজার ও জিমখানা ঘাটে অবস্থান করতো। এ খালটি স্থানীয় লোকজনের দৈনন্দিন গোসল, সাঁতার কাটা, মাছ ধরাসহ বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের স্থান ছিল। নব্বই দশকের পর অবৈধ দখল, দূষণ ও নাব্য হ্রাসের ফলে খালটি বদ্ধ জলাশয়ের আকার ধারণ করে।

খালটি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বাবুরাইল খাল পুনরুদ্ধারসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শোভাবর্ধন এবং আলোকিতকরণ (শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ধলেশ্বরী নদী পর্যন্ত)’ প্রকল্প চলমান। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের প্রায় ৮৫ শতাংশ কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত পাইকপাড়া মিউচুয়াল ক্লাব
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরে ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে পাইকপাড়া ঐতিহাসিক মিউচুয়াল ক্লাব অবস্থিত। ক্লাবটি ১৯২৭ সালে স্থাপিত হয়। জাতির পিতার স্মৃতিবিজড়িত মিউচুয়াল ক্লাবের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ক্লাবটি পুনঃনির্মাণ করেন। দর্শনীয় ভবনটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়।

আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তন
আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তনটি নারায়ণগঞ্জ নগরীর ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯২৯ সালে পৌর পাঠাগার নামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সাবেক পৌরসভার চেয়ারম্যান আলী আহাম্মদ চুনকা পৌর পাঠাগারটি দোতলায় উন্নীত করেন। পরে ডা. আইভীর হাত ধরে পাঠাগারের নকশার কাঠামো পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে যুগোপযোগী ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ছয়তলা ভবন নির্মাণসহ মোট ব্যয় হয় ২৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নগরবাসীর অন্যতম সমস্যা। নগরীর মোট আয়তন ৭২ দশমিক ৪৩ বর্গকিলোমিটার। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের জন্য একটি গুরুতর পরিবেশগত সমস্যা। নারায়ণগঞ্জ শহর মূলত একটি শিল্প এলাকা। প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে শিল্পবর্জ্য যেমন- পলিথিন, কাপড় ও কাগজপত্র তৈরি হয়। এখানকার ৬০০ টন বর্জ্য থেকে ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। প্রকল্পের কাজ চলমান।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আওতায় নারায়ণগঞ্জ, কদমরসুল ও সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে এলইডি স্ট্রিট লাইট স্থাপন
৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এলইডি স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়েছে এসব এলাকায়। বিশেষ করে করপোরেশন এলাকার সড়কবাতি ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শিল্প সংস্কৃতির এই আদি নগরীর বাসিন্দাদের রাত্রিকালীন নিরাপদ চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও সর্বাঙ্গীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বাধুনিক বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এলইডি সড়ক বাতি স্থাপন করা হয়।

১০ তলা নগর ভবন
সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে ১০তলা নগর ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সালে। কাজ শেষ পর্যায়ে। ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হলে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব অফিস ভবন নির্মিত হবে, সম্প্রসারিত কর্মস্থল তৈরি হবে, নাগরিক সেবার মান বাড়বে এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনকে একটি উত্তম সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা সম্ভব হবে। এরই মধ্যে অফিস কার্যক্রম (আংশিক) নগর ভবনে শুরু হয়েছে।

নগরীতে আধুনিক জলাধার
পানি সংরক্ষণে একসময় আদমজী থেকে ডেমরা সড়ক পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার জলাধার নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে ৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার জলাধার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন। কিন্তু পরবর্তীকালে এই এলাকায় জনবসতি বাড়ায় অবৈধ দখল, দূষণ ও প্রতিনিয়ত মানুষের বর্জ্য ফেলার কারণে খালটি ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত হয় এবং কালক্রমে অস্তিত্ব বিলীন হতে থাকে। বিলুপ্ত জলাধারটি উদ্ধার ও নির্মল পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জ লেক (শিমরাইল থেকে ভাঙ্গারপুল পর্যন্ত) পুনঃখনন ও খালের পশ্চিম পাড়ে রাস্তা, ড্রেন, ব্রিজ, ওয়াকওয়ে, ল্যান্ডস্কেপিংসহ সৌন্দর্যবর্ধন শীর্ষক প্রকল্পটির মাধ্যমে এ কাজ চলমান। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের পরিবেশ উন্নয়নসহ এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের গণপরিসরের চাহিদা পূরণ হবে।

এছাড়া কদমরসুল অঞ্চলে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিবাস নির্মাণ, অপরাজিতা নগর বিদ্যালয়, কলরব স্কুল, কেন্দ্রীয় কবরস্থান সিটি জামে মসজিদ ও পাক পাঞ্জাতন সিটি জামে মসজিদ উন্নয়নের রূপকার মেয়র আইভী।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen + eight =

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর