রবিবার, মার্চ ১৪, ২০২১




কেউ নামল পথে, কেউ পেল ঘরের চাবি

নারায়ণগঞ্জ প্রতিদিন:

প্রায় ১৪ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে গেল। লালদিয়ার চর থেকে ৪৯ বছরের ভিটেমাটি ছেড়ে নীরবে চলে গেছে এখানকার বাসিন্দারা। নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য তো নেই। তাই কে কোথায় গেল জানি না। শুধু জানি, বাকিটা জীবন কর্ণফুলীতীরের এই মানুষগুলোর বুকে বাজবে ঢেউ ভাঙার শব্দ।

হাইকোর্টের নির্দেশে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য বেশ জোরদার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বাড়িঘর ভাঙার জন্য বুলডোজার, ‘উচ্ছৃঙ্খল’ বা প্রতিবাদী লোকজনকে ঠেকানোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের সদস্যরাও প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু ১ মার্চ সকালে দেখা গেল এসব কোনো কিছুরই প্রয়োজন নেই, বিনা বাক্যব্যয়ে চলে যাচ্ছে আবালবৃদ্ধবনিতা। শুধু বারবার পেছন ফিরে তাকিয়ে চোখের জল সংবরণ করতে পারছিল না তারা। কেউ কেউ আগে থেকেই নিজেদের ঘরবাড়ি ভেঙে দরজা-জানালা, ইট-কাঠ খুলে নিয়েছিল, কেউবা এসব নিয়ে যাবেই–বা কোথায়, এই চিন্তায় দিশেহারা হয়ে শূন্য হাতেই ছেড়ে গেছে আজন্ম আবাস।চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলেছেন, ‘তারা গরিব হলেও আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তারা একটি ঢিল পর্যন্ত ছোড়েনি। ‘গরিব হলেও’ কথাটির পুনরুক্তি করে চেয়ারম্যান মহোদয়কে নতুন করে কে বোঝাতে যাবে চিরকাল গরিবেরাই তো আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল!

কিন্তু আমরা কতটা সচেতন ও শ্রদ্ধাশীল তাদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে? ১৯৭২ সালে বিমানঘাঁটি সম্প্রসারণের সময় জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পতেঙ্গার ‘নিষ্কণ্টক জমি’র পরিবর্তে লালদিয়ার চরে জায়গা দেওয়া হয়েছিল শতাধিক পরিবারকে। লালদিয়ার চর পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির নেতৃস্থানীয়রা বলছেন, কোনো কাগজপত্র নয়, সেই সময় মৌখিক আশ্বাসের ভিত্তিতে বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল পরিবারগুলো। কিন্তু উচ্ছেদের আগে তাদের দাবির কোনো যুক্তিযুক্ততা আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করল না কেউ! আর কিছু না হোক, ৪৯ বছর ধরে গড়ে ওঠা একটা বসতিকে ধু ধু প্রান্তর বানিয়ে দেওয়ার আগে একবারও তাদের স্থায়ী-অস্থায়ী পুনর্বাসনের কথাও মাথায় এল না কারও! আদালতের নির্দেশ এভাবে বুলডোজার দিয়ে বাস্তবায়ন করতে চাইলে মানবতার প্রশ্নটি তো উঠবেই। উচ্চ আদালতের রায় কার্যকর করার আগেই তাদের পুনর্বাসন করার কোনো উদ্যোগ কেন নিল না প্রশাসন। আপাতত আপদ বিদায় করতে পেরে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, লালদিয়ার চরের মানুষকে পুনর্বাসন করার জন্য তাঁরা জেলা প্রশাসনের কাছে তালিকা পাঠিয়েছেন। পাঠিয়েছেন বটে, তিনি নিজেও হয়তো জানেন ওই তালিকার নামগুলো পড়ে দেখার সুযোগ ও সময় আর কখনো কারোরই হবে না। যদি সত্যিই সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকত, অনেক আগে থেকেই জেলা প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক-সামাজিক নেতাদের এবং পুনর্বাসন কমিটির নেতৃস্থানীয়দের নিয়ে দফায় দফায় সভা করত বন্দর কর্তৃপক্ষ। পুনর্বাসনের জন্য স্থান নির্ধারণ ও অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, তার উপায় বের করারও চেষ্টা করত। এসব কিছুই না করে জেলা প্রশাসনের কাছে একটি তালিকা পাঠিয়ে দিলে অপ্রয়োজনীয় কাগজের চেয়ে বেশি মূল্য এর থাকে না!

রাজনীতিবিদেরা নানা সময়ে আশা ও আশ্বাস দিয়েছিলেন লালদিয়ার চরবাসীকে। বিশেষত প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় (যথাক্রমে ২০০৫ ও ২০১৯) আংশিক উচ্ছেদের পর স্থানীয় সাংসদ এম এ লতিফ লালদিয়ার বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করেছিলেন আর উচ্ছেদ হবে না। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নের আগে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম নগর কমিটির এক সভায় লালদিয়া চরের বাসিন্দাদের উচ্ছেদের ব্যাপারটি পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছিল। নগর কমিটির সহসভাপতি খোরশেদ আলম বলেছিলেন, এভাবে উচ্ছেদ করাটা অন্যায় হবে। কিন্তু তৃণমূলের রাজনীতিবিদদের কথা আমলে নেননি দলের নীতিনির্ধারকেরা। উচ্ছেদের অনেক আগে (২৪ ফেব্রুয়ারি) নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের জায়গা অবৈধভাবে দখল করে থাকার সুযোগ নেই।…এ ঘটনায় যারা উসকানি দিচ্ছে, তাদের তালিকাও আমাদের কাছে আছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একজন রাজনীতিকের কণ্ঠে এ রকম জমিদারসুলভ বক্তব্য সচেতন মানুষকে বিস্মিত করেছে, বিশেষত তাঁর দলেরই তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা যখন লালদিয়ার চরের বাসিন্দাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় একজন নেতা ও সরকারের মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা চুপসে গেছেন, আর কেউ ‘উসকানিদাতা’র তকমা গায়ে লাগাতে রাজি নন। অথচ চট্টগ্রামবাসীর মনে থাকার কথা, আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরী একটি মার্কিন সংস্থাকে বন্দরের বেসরকারি টার্মিনাল নির্মাণ ও দুই শ বছরের জন্য পরিচালনার সরকারি অনুমোদনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন এবং রুখে দিয়েছিলেন। তখনো ক্ষমতাসীন ছিল তাঁর দল আওয়ামী লীগ।

২০০৫ সালে আংশিক উচ্ছেদের পর লালদিয়ার চরের জায়গাটি ইজারা দেওয়া হয়েছিল ইনকনট্রেড নামের একটি বেসরকারি সংস্থাকে। জাতীয় স্বার্থের কথা ভাবলে কর্ণফুলীতীরের এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বেসরকারি সংস্থাকে না দিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু বিত্ত ও প্রভাবের কাছে কীভাবে হার মানে জাতীয় স্বার্থ, এটাও বোধ হয় তার একটি উদাহরণ। সাম্প্রতিক উচ্ছেদের পর বন্দর কর্তৃপক্ষ অবশ্য আগেভাগেই বলে রেখেছে, এবার আর বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে না, বন্দর নিজেদের কনটেইনার রাখার জন্য এই জমি ব্যবহার করবে। এই সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত থাকবে কি না, সময়ই তা বলে দেবে।

মুজিব বর্ষে ৬৬ হাজার ১৮৯টি গৃহহীন পরিবারকে ঘরের চাবি বুঝিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার নিঃসন্দেহে একটি গণমুখী উদ্যোগ নিয়েছেন। এমনকি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ভাসানচরে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা নিয়ে প্রথম দিকে সংশয় থাকলেও তা প্রশংসিত হচ্ছে এখন। কিন্তু এই সরকারের আমলেই নিজেদের বসতবাড়ি থেকে খোলা আকাশের নিচে নেমে এল কয়েক হাজার মানুষ—পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। এই বৈপরীত্যকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 − 9 =

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর